খিস্তিচরিত-দ্বিতীয় কিস্তি


“মিলে স্ল্যাং মেরা তুমহারা, তো গ্যাং বনে হামারা”
“...হেথায় আর্য, হেথা অনার্য, হেথায় দ্রাবিড় চীন-
শক-হুন-দল পাঠান-মোগল খিস্তিতে হল লীন”~

যেকোনো ভাষাতেই স্ল্যাং সেই ভাষার অমুল্য সম্পদ। প্রকৃতপক্ষে, ইংরিজি কথা স্ল্যাং এর অর্থ ঠিক খিস্তি না। স্ল্যাং তুলনামুলকভাবে আরও বড় একটি সেট, খিস্তি কে যার সাবসেট বলা চলে। স্ল্যাং আসলে, কোন ভাষা ব্যবহারকারী মানুষজনের মধ্যে একটি বিশেষ কোন সম্প্রদায়ের কথ্য ভাষা,যেখানে তাঁদের নিজস্ব কিছু custom শব্দ তাঁরা যোগ করেন। যেমন, আমরা বন্ধুরা নিজেদের মধ্যে কথা বলার সময়ে প্রায় সর্বদাই “বাওয়াল”, “বিলা” ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করি, এগুলো ঠিক বাংলা চলিতভাষা না, এগুলো ঐ স্ল্যাং সেট এর মধ্যে পড়ে, অথচ এগুলো খিস্তি ও না।
বাংলা খিস্তির নিজস্ব ক্ষমতা, নিজস্ব মাধুর্য রয়েছে।প্রলেতারিয়েত থেকে বুর্জোয়া, অশিক্ষিত রিকশওয়ালা থেকে উচ্চশিক্ষিত প্রফেসর-খিস্তিই এমন এক জায়গা যেখানে সবাই সমান। হ্যাঁ,পার্থক্য যেটুকু থাকে, সেটুকু বাচনভঙ্গিমা ও ডায়ালেক্ট এর, আর অনেক ক্ষেত্রে অর্থের সামান্য প্রকারভেদ লক্ষ্য করা যায়। অবশ্য অর্থের পার্থক্যটুকু ব্যবহারের উপরেও নির্ভরশীল। যাক সে সব কথা।

***

আমার এই লেখার প্রধান উদ্দেশ্য একটাই, বাংলা খিস্তিকে আরও জনপ্রিয় ও প্রচলিত করে তোলা, ও চেপে বসা বিভিন্ন ইংরাজি ও অন্যান্য ভাষার বেনোজল খিস্তিকে দূর করা।
আজ যে খিস্তির গুষ্টির ষষ্ঠীপুজো করব বলে ঠিক করেছি, সেটি একটি monosyllable খিস্তি। খুব ছোট্ট, অথচ অতীব ক্ষমতাসম্পন্ন এবং বহুল প্রচলিত,নকুলদানার মত খিস্তি- “বাল”।
হিন্দি শব্দ “বাল” অর্থ মুলত দুটি-বাচ্চা [উদাঃ-বাল হনুমান^*] ও অন্য অর্থে চুল [শুধু মাথার নয়,অন্য জায়গারও] । তবে, খিস্তি হিসেবে এটির অর্থ প্রধানত যৌনকেশদামগুচ্ছ বোঝানো হয়।
এই ছোট্ট, একমাত্রিক শব্দটির ব্যবহার বোধকরি সবথেকে বেশি। একে বাক্যে adverb এর মত যেকোনো জায়গায় ব্যবহার করা যায়, মূল অর্থে ব্যবহার না করে নমনীয়ভাবে প্রায় যেকোনো অর্থে ব্যবহার করা যায়। এতটা নমনীয়তা ও কমনীয়তা (খুবই কমন ও কমনীয়)-র মিশেল কম খিস্তিতেই দেখা যায়। তাই, এই বিধর্মী শব্দটি সসম্মানে বাংলা খিস্তিদের মধ্যে নিজের জায়গা বেশ উপরের দিকেই করে নিয়েছে নিজ যোগ্যতায়।
এর সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় “বাল ছেঁড়/ছেঁড়ো/ছিঁড়ুন” এই শব্দগুচ্ছ হিসেবে। আক্ষরিক অর্থ মেনে যদি কেউ যৌনকেশদাম উৎপাটন করতে যায় তবে শারীরিক ক্ষতির সম্ভাবনা প্রবল। তাই, এই শব্দগুচ্ছের ব্যবহার এই অর্থে হয়-“যা খুশি করুন, চুলোয় যান” ইত্যাদি।
“বাল দেব”-অর্থাৎ কিচ্ছু দেবো না।
“বাআআআআল”-অনেকটা ইংরাজি “what the fuuuck,maan” এর মত অর্থ, তবে আরও ব্যাপক।
“বাল যাব”-অর্থাৎ, আমি কোনোমতেই যাব না।
“বাল ছিঁড়েছি”-অর্থাৎ ডাহা ব্যর্থ হয়েছি।
এছাড়াও আরও অনেক ব্যবহার হয় ও হতে পারে। কারোর মনে নতুন কিছু এলে কমেন্ট করুন।
“তোমার স্ল্যাং আমার স্ল্যাং,সৃষ্টি করুক খিস্তি গ্যাং”- এই হোক আমাদের মূলমন্ত্র।
“বাল” অর্থাৎ চুল নিয়ে চুলোচুলির শেষে, নীতিকথা : “যদি কেউ আপনাকে বাল দেয়, তাহলে নিয়ে নিন। বাল অর্থাৎ কেরাটিন, আর তা জমিয়ে জমিয়ে বেচে দিন; ভালো দাম পাবেন,কারণ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি তে কেরাটিন খুবই প্রয়োজনীয়।”

[^*আমি হনুমান কে খিস্তি দিইনি, এই নামের একটা সিনেমা আছে, তাই বললুম।]   

পরের পর্ব কবে আসবে বলা যাচ্ছে না। তবে আসবে কোন একদিন, এটুকু আশ্বাসবাণী দিতে পারি। ভালো থাকিস/ থেকো/ থাকবেন। আর, বাংলা ভাষা আমাদের প্রাণের ভাষা, বহু রক্তক্ষয়ের মধ্যে দিয়ে আজ এই ভাষা নিজের জায়গায় সসম্মানে আছে। এর সম্মানরক্ষা আমরা বাংলা ভাষাভাষীরা না করলে কেউ করবে না।

Comments

Popular posts from this blog

খিস্তিচরিত-তৃতীয় কিস্তি

খিস্তিচরিত-চার কিস্তিতে